Logo
Logo
×

সারাদেশ

একই জেলায় ‘অঘোষিত স্থায়ী পোস্টিং’: নীতিমালা উপেক্ষায় প্রশ্নবিদ্ধ প্রশাসন

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:১৭ পিএম

একই জেলায় ‘অঘোষিত স্থায়ী পোস্টিং’: নীতিমালা উপেক্ষায় প্রশ্নবিদ্ধ প্রশাসন

প্রতিকী ছবি

বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদায়নে নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকার নির্ধারিত নীতিমালা থাকলেও মাঠ প্রশাসনে তার বাস্তব প্রতিফলন কতটা কার্যকর—তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে কর্মরত আনিসুর রহমানের দীর্ঘদিন একই জেলায় অবস্থান সেই প্রশ্নকে আরও তীব্র করেছে। এদিকে দীর্ঘদিন একই জেলায় তার পরিচিতির কারনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে পক্ষপাতিত্বমূলক সুবিধা দেওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গত ১৮ ডিসেম্বর (বৃহস্পতিবার) বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনার বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন চাঁপাইবাসী। অভিযোগের অনুলিপি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের নিকট পাঠানো হয়েছে। অভিযোগের ১৭ দিন অতিবাহিত হলেও কোন পদক্ষেপ নেয়নি সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকতারা। 

অভিযোগ সূত্রে জানাযায়, বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ৩৪তম ব্যাচের কর্মকর্তা আনিসুর রহমান ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদান করেন। এর আগেও তিনি একই জেলায় সদর উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং পরে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর (আরডিসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সব মিলিয়ে তিনি প্রায় তিন বছর ধরে একই জেলায় গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালন করছেন।

২০১৫ ও ২০২২ সালের বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের পদায়ন নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা রয়েছে—একজন কর্মকর্তাকে একই জেলায় একাধিকবার পদায়ন করা যাবে না। একই সঙ্গে যে জেলায় কোনো কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানে পরবর্তীতে তাকে রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর বা ভূমি সংশ্লিষ্ট অন্য গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা যাবে না।

প্রশ্ন উঠছে—এই নীতিমালা তাহলে কাদের জন্য? আর কোন প্রক্রিয়ায় আনিসুর রহমান বারবার একই জেলায় বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পাচ্ছেন?

অনুসন্ধানে জানা যায়, সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে নামজারি, মিস কেস ও তদন্ত কার্যক্রমে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। একাধিক ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন ভূমি অফিসের মাধ্যমে গোপনে অর্থ গ্রহণ করে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে মামলা ও নামজারি নিষ্পত্তি করা হতো।

এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ জমা পড়লেও এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। প্রশ্ন উঠছে—অভিযোগগুলো কি প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে আলোর মুখ দেখছে না?

স্থানীয় প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দীর্ঘদিন একই জেলায় দায়িত্ব পালনের কারণে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে আনিসুর রহমান একটি অঘোষিত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা না থাকলে অনেক কাজ অগ্রসর হয় না—এমন অভিযোগও উঠেছে।

দীর্ঘদিন একই জেলার কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে ওঠায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নিরপেক্ষতা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সচেতন নাগরিকরা।

আগামী ফেব্রুয়ারীতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। নির্বাচনকালীন সময়ে মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘদিন একই জেলায় অবস্থান করা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠায় নির্বাচন ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন স্থানীয়রা।

এই প্রেক্ষাপটে গত ১৮ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জের কয়েকজন বাসিন্দা বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনার বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের অনুলিপি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কাছেও পাঠানো হয়। তবে অভিযোগ দায়েরের ১৭ দিন পার হলেও কোনো তদন্ত কমিটি গঠন বা প্রশাসনিক পদক্ষেপের খবর পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ প্রসঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আনিসুর রহমান জানান, এই বিষয়ে আমি কোন মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। পোস্টিং দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। আমাকে কেন একই জেলায় রাখা হচ্ছে, তা আমার জানা নেই।

রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদ বলেন, সরকার চাইলে একই জেলায় বারবার পদায়ন দিতে পারে। বদলি ও পদায়ন সংক্রান্ত পরিপত্র বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমি অবগত নয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে কথা বললে তারা বিস্তারিত বলতে পারবে। 

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের (নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ অনুবিভাগ) ঊনি অধিশাখার যুগ্মসচিব মিঞা মুহাম্মদ আশরাফ রেজা ফরিদীর জানান, এক জেলাতে সেখানে এসিল্যান্ড থাকবে পরবর্তী সেখানে পোস্টিং হবেনা। মাঝখানে অন্য স্টেশন থেকে আবার আসতে পারবে এখানে বাঁধা নেই। বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদায়ন নীতিমালা সম্পর্কে জানতে চাইলে জানান, এ ব্যাপারে মাঠ প্রশাসনের রাহিমা ম্যাডাম ভালো বলতে পারবেন।

অন্যদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসন শাখার যুগ্মসচিব রাহিমা আক্তার জানান, ইউএনও হিসেবে গেলে তিনি এডিসি হিসেবে যেতে পারবেন না। এসিল্যান্ড হিসেবে গেলে এডিসি হিসেবে যেতে পারবেন। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, নীতিমালা অনুসারে কোনো কর্মকর্তাকে একই জেলায় একাধিকবার পদায়ন করা যাবে না। এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদে কর্মরত ছিলেন এমন জেলায় পরবর্তীতে ল্যান্ড এ্যাকুইজিশন অফিসার/রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর পদে পদায়ন করা যাইবে না। উত্তরে তিনি জানান, নিয়মনীতি দেখে বিষয়টি জানানো হবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র সংক্রান্ত বিষয়ে কর্মকর্তার এমন মন্তব্যে উত্তরটি আজও ধোঁয়াশার মধ্যেই থেকে গেছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বগুড়া ও নওগাঁসহ বিভিন্ন জেলায় একই ধরনের চিত্র বিদ্যমান। একাধিক বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তা একই জেলায় এসিল্যান্ড, আরডিসি, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক কিংবা ইউএনও হিসেবে একের পর এক দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার ইঙ্গিত দিচ্ছে।


প্রধান সম্পাদক- আ.ত.ম. শামসুজ্জামান

ইশা ফাউন্ডেশন’র একটি প্রকাশনা

অনুসরণ করুন