ভুয়া ওয়ার্ক পারমিট ও নকল ভিসা চক্র:
প্রায় দুই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬, ০৬:৪৭ পিএম
অভিযুক্ত মিনহাজ (রাঁয়ে) ও সাঈদ - ছবি সংগৃহীত
জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে প্রায় দুই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে মিনহাজ (৩০) নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে তার প্রতারণার বিষয়টি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই প্রতারণার সঙ্গে জড়িত রয়েছে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থানার লক্ষীপুর মধ্যপাড়া গ্রামের আব্দুর সাত্তারের ছেলে সাঈদ আহমেদ। তারা একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র গড়ে তুলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে লক্ষ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছে।
ভুক্তভোগী টিপু সুলতান জানিয়েছেন, সার্বিয়ায় ভিসা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মিনহাজ তার কাছ থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা নিয়েছিলেন। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হলেও ভিসা না দিয়ে টাকা ফেরত দেননি। টাকা চাইতে গেলে তাকে হুমকি ও গালাগাল সহ্য করতে হয়েছে। আরেক ভুক্তভোগী আরিফুল ইসলাম জানান, ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা নেওয়ার পর তাকে ভুয়া ওয়ার্ক পারমিট দেওয়া হয়েছে। এই প্রতারণার প্রমাণ হিসেবে একটি অডিও রেকর্ডও প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, চক্রের মূল হোতা মিনহাজ আহমেদ বর্তমানে পোল্যান্ডে অবস্থান করছেন এবং তার সহযোগী সাঈদ আহমেদ রয়েছেন দুবাইয়ে। বিদেশে অবস্থান করেই তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের সহজ-সরল মানুষ ও প্রবাসীদের টার্গেট করে আসছে।
প্রতারক চক্রটি সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, বসনিয়া ও মেসিডোনিয়াসহ বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশের দূতাবাসে ভিসা আবেদনের জন্য ভুয়া ওয়ার্ক পারমিট ব্যবহার করে। ভিসা বাতিল হলে তারা নকল স্টিকার ভিসা তৈরি করে পাসপোর্টে সংযুক্ত করে দেয়। এরপর বিএমইটি স্মার্ট কার্ডের ব্যবস্থা করে বিমান টিকিট কেটে ভুক্তভোগীদের বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব যাত্রী বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে আটক হলেও, অভিযোগ রয়েছে কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতায় কেউ কেউ বিদেশে পৌঁছে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন।
এ ধরনের প্রতারণার কারণে বাংলাদেশের শ্রমবাজার আন্তর্জাতিকভাবে হুমকির মুখে পড়ছে। ইতোমধ্যে ইউরোপের কয়েকটি দেশ ভুয়া ওয়ার্ক পারমিটের প্রমাণ পাওয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ওয়ার্ক পারমিট প্রদান কমিয়ে দিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সার্বিয়া, বসনিয়া ও রোমানিয়ার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাংলাদেশি পাচারকারী চক্রের অন্তত এক ডজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সিলেটের কয়েকজন রয়েছেন। এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট দেশের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের বৈঠকেও আলোচনা হয়েছে এবং দোষীদের বিচার শেষে কারাদণ্ড বা নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও চক্রের মূল হোতা মিনহাজ আহমেদ এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।
এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপ ও দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের প্রতারণা অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই দ্রুত এই চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

