Logo
Logo
×

সারাদেশ

ভৈরবে বিরোধের জেরে সংঘর্ষ, আহত ১০

Icon

ভৈরব সংবাদদাতা

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০৩:০৬ পিএম

ভৈরবে বিরোধের জেরে সংঘর্ষ, আহত ১০

ছবি-সংগৃহীত

কিশোরগঞ্জের ভৈরবে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে দুই পক্ষের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষে দুই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), ১০ জন পুলিশ সদস্য এবং রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ উভয় পক্ষের অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। কয়েক ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে ভৈরব রেলওয়ে জংশন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরো এলাকা কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

সংঘর্ষকারীরা ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে অবস্থান নিয়ে স্টেশন মাস্টারের কক্ষ, টিকিট কাউন্টারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুর চালায়। পরিস্থিতির অবনতির কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-সিলেট রেলপথে ট্রেন চলাচল প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ থাকে। এতে বিভিন্ন স্টেশনে অন্তত ছয়টি আন্তঃনগর ও লোকাল ট্রেন আটকা পড়ে এবং শত শত যাত্রী চরম দুর্ভোগে পড়েন।

গতকাল বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সন্ধ্যার পর থেকে রাত ১টা পর্যন্ত ভৈরব রেলওয়ে স্টেশন এবং আশপাশের এলাকায় দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে সেনাবাহিনী, র‍্যাব, পুলিশ এবং প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে রাত ১টা ৪০ মিনিটে মেঘনা সেতুর কাছে আটকে থাকা ঢাকাগামী মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার মাধ্যমে রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৫ দিন আগে পৌর শহরের পঞ্চবটি এলাকার যুবকদের সঙ্গে জগন্নাথপুর এলাকার যুবকদের একটি ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে বিরোধ সৃষ্টি হয়। খেলার মাঠের সেই বিরোধ পরবর্তীতে দুই এলাকার তরুণদের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি করে। এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার বিকেলে ভৈরব রেলস্টেশন এলাকায় জগন্নাথপুর এলাকার সোহেল মিয়ার ছেলে লিয়ামকে মারধরের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, পঞ্চবটি এলাকার কয়েকজন যুবক তাকে মারধর করেন। খবর ছড়িয়ে পড়লে দুই এলাকার লোকজন দ্রুত জড়ো হয়ে মুখোমুখি অবস্থান নেয়।

একপর্যায়ে উভয় পক্ষের শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র, লাঠিসোঁটা, ইট-পাটকেল এবং রেললাইনের পাথর নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষ ক্রমেই ভয়াবহ রূপ ধারণ করলে রেলস্টেশন এলাকা ও আশপাশের সড়কজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে উত্তেজিত লোকজন ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করে। তারা স্টেশন মাস্টারের কক্ষ, টিকিট কাউন্টারসহ কয়েকটি অফিস কক্ষে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে। এতে স্টেশনের বিভিন্ন সরঞ্জাম ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষকারীরা রেললাইনের পাথর তুলে একে অপরের দিকে ছুড়তে থাকে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে স্টেশনে অবস্থানরত যাত্রীদের অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটাছুটি শুরু করেন।পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রথমে রেলওয়ে থানা পুলিশ এবং রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তবে সংঘর্ষকারীদের ব্যাপক পাথর নিক্ষেপের মুখে তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হন। পরে ভৈরব থানা পুলিশ ও শহর ফাঁড়ির সদস্যরা যোগ দিলেও সংঘর্ষ আরও ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে র‍্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যদেরও মোতায়েন করা হয়।

আহতদের মধ্যে রয়েছেন, ভৈরব থানার ওসি আতাউর রহমান আকন্দ, রেলওয়ে থানার ওসি সাঈদ আহমেদ, এসআই ইমদাদুল কবীর, এসআই সাইফুল, এসআই জহুরুল ইসলাম, কনস্টেবল মেহেদী হাসান, সুলতান মাহমুদ, মিন্টু মিয়া, মাহমুদুল হাসান ও দাউদ নবী। এছাড়া রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মুছাসহ আরও অনেকে আহত হন।

সংঘর্ষের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট রুটে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এতে ঢাকাগামী দুটি মহানগর এক্সপ্রেস, পারাবত এক্সপ্রেস, এগারসিন্ধুর প্রভাতী, তিতাস কমিউটার এবং কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেসসহ অন্তত ছয়টি ট্রেন বিভিন্ন স্টেশনে আটকা পড়ে। হাজারো যাত্রী দীর্ঘ সময় ট্রেনের ভেতরে ও স্টেশন এলাকায় আটকে থাকেন। অনেক যাত্রী রাতভর অনিশ্চয়তার মধ্যে অপেক্ষা করেন।

পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কেএম মামুনুর রশীদ এবং উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এএইচএম আজিমুল হক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তাদের সঙ্গে র‍্যাব, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনা করেন। প্রায় ছয় ঘণ্টার চেষ্টার পর রাত ১টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ট্রেন চলাচলের অনুমতি দেয়।

ঢাকা মহানগর এক্সপ্রেসের যাত্রী মো. জসিম উদ্দিন বলেন, “জরুরি কাজে ঢাকায় যাওয়ার জন্য নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই আমি স্টেশনে এসে অপেক্ষা করছিলাম। শুরুতে সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও হঠাৎ করে সংঘর্ষের কারণে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। এতে আমরা শত শত যাত্রী স্টেশনের ভেতরে ও প্ল্যাটফর্মে আটকে পড়ি। সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয় তথ্যের অভাবে, কখন ট্রেন চালু হবে, আদৌ চলবে কি না, সে বিষয়ে কেউই স্পষ্ট কিছু জানাতে পারেনি।

কিশোরগঞ্জগামী যাত্রী নাজমা আক্তার বলেন, হঠাৎ করেই চারদিকে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হয়। এরপর ইট-পাটকেল ছোড়াছুড়ি এবং দৌড়াদৌড়ি শুরু হলে পুরো স্টেশনজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আমার শিশুরা ভয়ে কান্না শুরু করে। কোথায় যাব, কী করব কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আশপাশের অনেক নারী ও শিশু আতঙ্কে কাঁদছিল।

ঢাকা ফেরত ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান বলেন,"ঢাকায় ব্যবসার জরুরি কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরছিলাম। সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে দ্রুত পরিবারের কাছে ফিরতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ভৈরব স্টেশনে এসে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হব, তা কখনো ভাবিনি। সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর পুরো এলাকা অচল হয়ে পড়ে। ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘ সময় স্টেশনে আটকে থাকতে হয়েছে।

বয়স্ক যাত্রী আবদুল মালেক বলেন,"আমি অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যাচ্ছিলাম। স্টেশনে এসে দেখি চারদিকে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। মানুষের ছোটাছুটি, চিৎকার আর সংঘর্ষের দৃশ্য দেখে খুবই ভয় পেয়ে যাই। আমার মতো অসুস্থ ও বয়স্ক যাত্রীদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও কষ্টদায়ক ছিল। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে, কিন্তু কোথাও স্বস্তি ছিল না। চিকিৎসার জন্য সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারব কি না, সেই দুশ্চিন্তায় ছিলাম। এমন ঘটনা সাধারণ মানুষের জন্য খুবই দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।"

এদিকে ভৈরব রেলওয়ে স্টেশন ও আশপাশের এলাকায় চলমান অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে মহানগর গোধূলী ট্রেনে আটকে পড়া সাতজন বিদেশগামী যাত্রীকে স্থানীয় ছাত্র ও যুব সমাজের সহযোগিতায় বিকল্প পথে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে ব্যবস্থা করে দেয়। 

এ বিষয়ে ছাত্র ও যুব সমাজের পক্ষ থেকে মোবারক হোসেন বলেন, পরিস্থিতির জটিলতা বিবেচনা করে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয়ভাবে সমন্বয় করে তাদের নিরাপদে ঢাকা এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করি। 

বিদেশগামী যাত্রীদের আমিনুল ইসলাম বলেন, আমাদের সবারই নির্দিষ্ট সময়ে ফ্লাইট ছিল এবং আমরা ভেবেছিলাম যে এই পরিস্থিতির কারণে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বিদেশযাত্রা সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হয়ে যাবে। ঠিক সেই সময় স্থানীয় ছাত্র ও যুব সমাজ আমাদের পাশে এসে দাঁড়ায়।

ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার জানান, “ফুটবল খেলার বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে স্টেশন এলাকায় হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। এতে স্টেশনের বিভিন্ন কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাত ১টা ১০ মিনিটে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পৌঁছে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ট্রেন চলাচলের উপযোগী ঘোষণা করে। এরপর রাত ১টা ৩০ মিনিটে পুনরায় ট্রেন চলাচল শুরু হয়। এর আগে রাত ৯টা ১৫ মিনিটে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। রাত ১টা৪০ মিনিটে মহানগর গোধূলীসহ কয়েকটি ট্রেন স্বল্প বিরতিতে স্টেশন অতিক্রম করে গন্তব্যে চলে যায়।

ভৈরব রেলওয়ে থানার ওসি সাঈদ আহমেদ বলেন, পরিস্থিতি শান্ত করতে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছেন। সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই বাছাই করে দোষীদের শনাক্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভৈরব থানার ওসি আতাউর রহমান আকন্দ বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও হামলার শিকার হন এবং কয়েকজন আহত হন, যার মধ্যে একজন পুলিশ সদস্যের পা ভেঙে যায়।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ কে এম মামুনুর রশীদ বলেন, এ ঘটনায় আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আহত হয়েছেন, পাশাপাশি সাংবাদিকরাও আহত হয়েছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত।

 

 

প্রধান সম্পাদক- আ.ত.ম. শামসুজ্জামান

ইশা ফাউন্ডেশন’র একটি প্রকাশনা

অনুসরণ করুন