এলজিইডিতে অনিয়মে যুগ পার:
প্রধান প্রকৌশলী বেলালের কব্জায় কয়েক’শ কোটির নিয়োগ ও আউটসোর্সিং বাণিজ্য
নিজস্ব সংবাদদাতা
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম
ছবি-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
দেশের অন্যতম বৃহত্তম উন্নয়ন সংস্থা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) যেন এখন দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। দপ্তরটিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থ উপার্জনের এক নেটওয়ার্ক। অভিযোগ রয়েছে যার মূলে রয়েছেন বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন। নিজের পদ-পদবি ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে সরকারি বিধিমালা ভেঙে বছরের পর বছর চালিয়ে যাচ্ছেন নিজস্ব আউটসোর্সিং ব্যবসা। শুধু তা-ই নয়, সরকারি কোষাগারের রাজস্ব ফাঁকি, পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্যে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে।
স্বার্থের সংঘাত ও 'আউটসোর্সিং' ব্যবসা:
অনুসন্ধানে জানা যায়, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেই মো. বেলাল হোসেন এলজিইডির সমবায় সমিতি 'এলকেএসএস হিউম্যান রিসোর্স সেন্টার'-এর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পে জনবল সরবরাহের কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে এই প্রতিষ্ঠানটি ব্যক্তি মালিকানাধীন সংস্থায় রূপ নিলে ট্রেড লাইসেন্সের একক মালিক হিসেবে নাম আসে বেলাল হোসেনের। অর্থাৎ, তিনি নিজেই দরপত্র আহ্বানকারী, নিজেই যাচাই কমিটির প্রধান এবং দিনশেষে নিজের ফার্মকেই পাইকারি দরে কার্যাদেশ প্রদানকারী। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে প্রায় ৩,৫০০ জনের আইনবহির্ভূত নিয়োগ এবং মোট ৬,৫০০ জনের বিশাল আউটসোর্সিং নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে তাঁর নিয়ন্ত্রণে। ব্যবসার টিন ও বিন TIN ও BIN ভূয়া অর্থাৎ অন্য কোনো ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামের টিন-বিন দিয়ে দীর্ঘদিন কাজ চালিয়ে (২০২৫ সালে) তিনি টিন- বিন আইন অমান্য করেছে।
কর ফাঁকি ও কর্মীদের তহবিল তছরুপ:
আইন অনুযায়ী, আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত কর্মীদের বেতন থেকে টিন ও ভ্যাট কর্তন করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া এবং কর্মীদের জন্য যৌথ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তহবিল গড়ে তোলার বিধান রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী: কর্মীদের বেতন থেকে কর্তন করা প্রায় ২০ কোটি টাকার টিন ও ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে। কর্মীদের প্রভিডেন্ট ও জমানো এক মাসের সমপরিমাণ বেতনের মোট ৩০ কোটি টাকার বেশি এককালীন সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এই জালিয়াতির প্রেক্ষিতে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হলেও কোনো আইনি পদক্ষেপের পরোয়া করেননি তিনি।
আইন ভেঙে পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা বাণিজ্য:
তদন্ত কমিটির নিজস্ব প্রতিবেদন ও মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনাকো বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতার নামে পদোন্নতি দেওয়ার বিনিময়ে কোটি কোটি টাকা ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা:
পদোন্নতির যোগ্যতাহীন ও বিতর্কিত প্রায় ২৫–৩০ জন কর্মকর্তাকে প্রতি জনের কাছ থেকে ১০ থেকে ৭০ লাখ টাকা নিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব প্রদান।বিভাগীয় পরীক্ষায় নিয়ম অনুযায়ী শূন্য পদের ৩০% কোটা পূরণের নিয়ম থাকলেও অতিরিক্ত পদ সৃষ্টি করে ১৩০ জনের বেশি প্রকৌশলীকে পদে বসিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায়। সার্ভেয়ার ও কার্যসহকারী পদ থেকে ৯৫০ জনের আবেদনের বিপরীতে সবাইকে উত্তীর্ণ দেখিয়ে ২০০টি শূন্য পদের বিপরীতে নতুন করে ১২ থেকে ১৫ কোটি টাকার দরকষাকষি। সরকারি সম্পত্তি পানির দরে ভাড়া দিয়ে আবার এলজিইডির নিজের ব্যবহারের জন্য চড়া মূল্যে বেসরকারি ভবন ভাড়া নেওয়ার মতো দ্বিচারিতাও এই অনিয়মের তালিকায় যুক্ত রয়েছে। এলজিইডির সার্বিক প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক কাজ এখন এই সীমাহীন দুর্নীতির কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনের মোবাইলফোনে একাধিকবার চেষ্টা ও বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া না দেওয়ায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদন : পর্ব–১

