রংপুরে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে ক্ষোভ, পুনর্বিবেচনার দাবি
রংপুর সংবাদদাতা
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৬ পিএম
ছবি-সংগৃহীত
জ্বালানি তেলের নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর রংপুরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভোক্তা, পরিবহন শ্রমিক ও কৃষিসংশ্লিষ্টরা। এক লাফে পেট্রোলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ায় পরিবহন ভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও কৃষি উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন তারা। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত এবং বর্ধিত দাম পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রোববার দিবাগত রাত ১২টার পর থেকে নতুন দামে জ্বালানি তেল বিক্রি শুরু হয়। নতুন মূল্য অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন দামের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রোববার রাতেই রংপুরের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। কিছু পাম্পে তেল না থাকায় এবং কয়েকটি পাম্পে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়।
তেল নিতে আসা কয়েকজন গ্রাহক অভিযোগ করেন, নতুন দাম কার্যকর হওয়ার আগে পুরোনো দামে কেনা তেল নতুন দামে বিক্রির চেষ্টা করা হয়েছে। এ ধরনের কারসাজির সঙ্গে জড়িত পাম্প মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
সোমবার সকালে রংপুরের মিজান ফিলিং স্টেশন, ইউনিক ফিলিং স্টেশন, সালেক ফিলিং স্টেশন ও সিটি ফিলিং স্টেশনসহ বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ঘুরে দেখা যায়, সরকার নির্ধারিত নতুন দামে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন বিক্রি হচ্ছে। তবে জ্বালানি কিনতে আসা গ্রাহকদের মধ্যে দাম বৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে অসন্তোষ দেখা গেছে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন খাতে ভাড়া বাড়ার পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় বেড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রংপুরের কৃষকরাও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বিগ্ন। এ অঞ্চলে সেচনির্ভর কৃষির ওপর নির্ভরতা বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্ষাকালেও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় অনেক সময় কৃষকদের বাড়তি সেচ দিতে হচ্ছে। ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সেচ ও কৃষি উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে বলে মনে করছেন তারা।
এরই মধ্যে ধান ও আলুসহ বিভিন্ন ফসলে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় কৃষকরা আর্থিক চাপে রয়েছেন। নতুন করে জ্বালানি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন খরচের চাপ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা তাদের।
ভুক্তভোগীদের দাবি, জ্বালানি তেলের নতুন দাম নির্ধারণের আগে গণশুনানির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়া উচিত ছিল। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে দেশের মানুষের আর্থিক সক্ষমতা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
রংপুরের একটি স্কুলের শিক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, আগে প্রতিদিন মোটরসাইকেলে যাতায়াতে প্রায় ২০০ টাকার তেল লাগত। এখন একই দূরত্বে প্রায় ২৫০ টাকার তেল লাগছে। এতে প্রতিদিন অতিরিক্ত ৪০ টাকার বেশি খরচ হচ্ছে, যা মাসে প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকার অতিরিক্ত ব্যয়। এই টাকা দিয়ে সন্তানের টিউশন ফি দেওয়া সম্ভব হতো বলে জানান তিনি।
ট্রাকচালক মফিজার রহমান বলেন, তেলের দাম বাড়লে প্রতিদিনই ভাড়া নিয়ে গ্রাহকদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়। তারা বাড়তি ভাড়া দিতে চান না। ফলে জ্বালানি খরচ বাড়লেও সেই অনুযায়ী ভাড়া পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে পেট্রোল পাম্প মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা সরকার নির্ধারিত দামেই জ্বালানি তেল বিক্রি করছেন।
সিটি ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী হারুন অর রশিদ বলেন, ‘আমরা সরকার নির্ধারিত দামেই জ্বালানি তেল বিক্রি করছি। এখন পর্যন্ত তেলের কোনো সংকট নেই। তবে দাম বাড়ায় গ্রাহক কিছুটা কমে যেতে পারেন। ফলে প্রতিদিন যে পরিমাণ তেল বিক্রি হতো, এখন আর সে পরিমাণ বিক্রি নাও হতে পারে।’
ভোক্তাদের দাবি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব যেন পরিবহন, কৃষি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি না করে, সে বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

