আলুর দরপতনে দিশেহারা জয়পুরহাটের কৃষক ও ব্যবসায়ীরা
জয়পুরহাট সংবাদদাতা
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫৭ পিএম
ছবি-সংগৃহীত
ভালো দামের আশায় হিমাগারে আলু রেখে এখন উল্টো লোকসানের বোঝা টানছেন জয়পুরহাটের কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। ভরা মৌসুমে বাম্পার ফলন হলেও মেলেনি কাঙ্ক্ষিত দাম। তাই মুনাফার আশায় হিমাগারে সংরক্ষণ করা আলু বাজারে দরপতনের ধাক্কায় এখন বড় লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একদিকে উৎপাদন, পরিবহন ও হিমাগার ভাড়ার বাড়তি খরচ, অন্যদিকে বাজারে মিলছে না প্রত্যাশিত দাম। ফলে লাভের বদলে উল্টো প্রতি বস্তায় বিপুল লোকসানের হিসাব কষছেন উত্তরের এই জনপদের আলুচাষিরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ মৌসুমে জয়পুরহাটে ৩৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে ৯ লাখ ১৯ হাজার ৫৯৪ মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। খাদ্য চাহিদা ও বীজের জোগান নিশ্চিতে জেলার ২২টি হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার ৯৮২ মেট্রিক টন আলু। হিমাগার কর্তৃপক্ষের বেঁধে দেওয়া সময় অনুযায়ী আগামী ১০ নভেম্বরের মধ্যে সব আলু খালাস করতে হবে। এর মধ্যে হিমাগারের যে আলু বিক্রি হয়েছে, তাতেই চাষি ও ব্যবসায়ীরা লোকসানে পড়েছেন। ফলে সামনে বাজারদর কেমন থাকে, তার ওপরই নির্ভর করছে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ক্ষতির পরিমাণ।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে কৃষকের ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৭ টাকা। এর সঙ্গে হিমাগার ভাড়া ৬ টাকা এবং পরিবহন ও আনুষঙ্গিক খরচ আরও ১ টাকা যোগ হয়ে প্রতি কেজিতে মোট খরচ দাঁড়িয়েছে ২৩ থেকে ২৪ টাকা। অথচ বর্তমান বাজারে সেই আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১৪ থেকে ১৫ টাকা দরে। ফলে নিজের শ্রম বাদ দিয়েও প্রতি কেজি আলুতে চাষি ও ব্যবসায়ীদের পকেট থেকে ৬ থেকে ৭ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে ।
পুনট হিমাগারে ৬০০ বস্তা আলু সংরক্ষণ করা কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, উৎপাদন খরচ, বস্তা কেনা, পরিবহন ও ভাড়াসহ প্রতি বস্তায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা খরচ পড়লেও বাজারে দাম মিলছে মাত্র ৮৫০ টাকা। এতে বস্তাপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা লোকসান হচ্ছে। ব্যবসায়ীরাও আলু নিচ্ছে না। সরকারের কাছে আবেদন আলু যেন বাহিরের দেশে পাঠানো হয়।
আরেক কৃষক আনিছুর রহমান বলেন, ২ বিঘা ১০ শতক মাটিতে গুটি আলু আর স্টিক আলু লাগিয়েছিলাম। স্টোরে রাখা আলু ৬২ কেজি ওজন ধরে বস্তাপ্রতি ৮৬০ টাকা বিক্রি করেছি। স্টোর ভাড়া ৪২০ টাকা আবার আলু বের করতে শ্রমিকের মজুরি ২০ টাকা, মোট ৪৪০ টাকা খরচ। আলুর বাজারে পুরোটাই ধস নেমে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে আমরা আলু চাষে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবো।
কৃষক সোহেল হোসেন বলেন, ২০ বস্তা আলু ৮৭০ টাকা দরে বিক্রি করেছি। এর মধ্যে হিমাগার ভাড়া দিতে হয়েছে বস্তাপ্রতি ৩৮০ টাকা। সব খরচ বাদ দিয়ে হাতে পেয়েছি প্রায় ৯ হাজার ৮০০ টাকা। এই আলুতেই প্রায় ৬ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। আগামীতে আর বাণিজ্যিকভাবে আলু চাষ করবো না, কেবল পরিবারের খাবারের জন্য লাগাবো।
দরপতনে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ব্যাংক, এনজিও বা মহাজনের কাছ থেকে সুদে ঋণ নেওয়া প্রান্তিক চাষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। কালাইয়ের ব্যবসায়ী মেহেদুল চৌধুরী বলেন, হিমাগার থেকে বস্তাপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা ঋণ নিয়ে প্রায় ৮ হাজার বস্তা আলু হিমাগারে রেখেছিলাম। প্রতি বস্তায় ১ হাজার ২২০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা খরচ হলেও ৫ হাজার বস্তা বিক্রি করে কোনো লাভ হয়নি, উল্টো লোকসান হয়েছে।
আরেক ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন বলেন, আলুর অবস্থা খারাপ। এর কারণ বাহিরের দেশে আলু যায়নি। কৃষক-ব্যবসায়ীদের অবস্থা খুবই খারাপ। সেসময় ১২ টাকা থেকে ১৩ টাকা কেজিতে আলু কেনা হয়েছে। এখনও প্রায় ওই রকম দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে। হিমাগার ভাড়া, পরিবহন খরচ তো আছেই। এতে কি কৃষক-ব্যবসায়ী বাঁচবে? সরকারের কাছে আবেদন করছি, আলু বাহিরের দেশে দ্রুত রপ্তানি করা হোক।
কালাইয়ের মেসার্স ইসরাত হিমাগারের হিসাবরক্ষক বদিউজ্জামান এবং পুনট হিমাগারের হিসাবরক্ষক এনামুল হক জানিয়েছেন, কম দামের কারণে এবার সব হিমাগার থেকে আলু খালাসের গতি অত্যন্ত ধীর। হিমাগার থেকে সময় মতো সব আলু বের হবে কি-না, সেটিও অনিশ্চিত। কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ঝুঁকির মধ্যে আছেন, সাথে আমরাও ঝুঁকি-অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. মনজু আলম সরকার বলেন, চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন হলেই বাজারে আলুর দাম পতন ঘটে। অতীতে দেখা গেছে, আলুর উৎপাদন কম হওয়ার কারণে বাজার দর অনেক বেশি ছিল। এই পরিস্থিতি এড়াতে আমাদের আলুর বহুমুখী ব্যবহার বাড়াতে হবে। আবার মানসম্মত আলু উৎপাদনের জন্য অবশ্যই ভালো মানের বীজ ব্যবহার করতে হবে। মানসম্মত বীজ ব্যবহার করলে দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশেও আলু রপ্তানি করা সম্ভব।

