ব্রহ্মপুত্রের বুকে নৌকার দৌড়, পাকুন্দিয়ায় হাজারো মানুষের মিলনমেলা
পাকুন্দিয়া (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৫ পিএম
ছবি-সংগৃহীত
ব্রহ্মপুত্রের বুক চিরে পাশাপাশি ছুটছিল একের পর এক নৌকা। মাঝিদের ছন্দময় বৈঠার আঘাতে মুহূর্তেই বাড়ছিল গতি। নদীর দুই পাড় থেকে ভেসে আসছিল করতালি, হর্ষধ্বনি আর উচ্ছ্বাস। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেও কমেনি দর্শনার্থীদের উচ্ছ্বাস। নৌকার ছুটে চলা, বৈঠার ছন্দ আর মানুষের আনন্দ-উল্লাসে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার ব্রহ্মপুত্রের দুই পাড় পরিণত হয় মিলনমেলা ও উৎসবের প্রাঙ্গণে।
বৃহস্পতিবার
(১ অক্টোবর) বিকেলে উপজেলার দক্ষিণ চরটেকী মিনি কক্সবাজার এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদে অনুষ্ঠিত
ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ ঘিরে এমনই উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দক্ষিণ চরটেকী গ্রামবাসীর
উদ্যোগে আয়োজিত এ নৌকাবাইচ দেখতে নদীর দুই পাড়ে জড়ো হন হাজারো নারী-পুরুষ, শিশু, তরুণ-তরুণী
ও বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ।
আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবারের প্রতিযোগিতায় ছোট-বড় মিলিয়ে অংশ নেয় মোট আটটি নৌকা। নির্ধারিত পথ পাড়ি দিতে গিয়ে মাঝিদের মধ্যে চলে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বৈঠার ছন্দে নৌকাগুলো যখন নদীর বুক দিয়ে ছুটে যায়, তখন দর্শকদের করতালি ও হর্ষধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে দুই পাড়।
তীব্র
প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রতিযোগিতা শেষে প্রথম স্থান অর্জন করে কটিয়াদী উপজেলার করগাঁও
এলাকার দুলাল চেয়ারম্যানের নৌকা। দ্বিতীয় হয় একই এলাকার হাবিবুর রহমান জালাল মিয়ার
নৌকা। তৃতীয় স্থান অর্জন করে পাকুন্দিয়ার বাহাদিয়া এলাকার ইসমাইলের নৌকা।
প্রথম
স্থান অর্জনকারী দলকে পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় একটি মোটরসাইকেল। দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী
দল পায় একটি রেফ্রিজারেটর এবং তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলকে দেওয়া হয় একটি এলইডি টেলিভিশন।
এ ছাড়া অংশ নেওয়া অন্য নৌকার দলগুলোকেও সান্ত্বনা পুরস্কার দেওয়া হয়।
নৌকাবাইচ
দেখতে মঙ্গলবাড়িয়া এলাকা থেকে আসেন নওশাদ আলম বাপ্পী। তিনি বলেন, ‘এখানে আমার ফুফুর বাড়ি। আমি এখানেই বড় হয়েছি। ছোটবেলায় নৌকাবাইচ দেখেছি।
এবার সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে আবারও দেখতে এসেছি। নৌকাবাইচ দেখে খুব ভালো লাগছে। পরিবার
নিয়ে এমন আয়োজন উপভোগ করার সুযোগ পাওয়া আনন্দের।’
গফরগাঁও
উপজেলার দত্তের বাজারের সবেদ আলী বলেন, ‘এখানে নৌকাবাইচ দেখতে এসেছি। নদীর দুই পাড়ে অনেক
মানুষের ভিড় হয়েছে। অনেক দিন পর এমন আয়োজন দেখতে পেরে খুবই আনন্দ লাগছে। নৌকার প্রতিযোগিতা
ও মানুষের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে চমৎকার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।’
আয়োজক
কমিটির পক্ষে কুতুব উদ্দিন কিরণ বলেন, ‘নৌকাবাইচ গ্রামবাংলার একটি ঐতিহ্যবাহী আয়োজন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ঐতিহ্য অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো গ্রামের
মানুষকে বিনোদনের সুযোগ করে দেওয়া এবং নতুন প্রজন্মের সঙ্গে এই ঐতিহ্যের পরিচয় করিয়ে
দেওয়া।’
নৌকাবাইচকে
ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন। প্রধান অতিথি
হিসেবে প্রতিযোগিতা উপভোগ করেন কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য
অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন। এর আগে নৌকাবাইচের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন পাকুন্দিয়া
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূপম দাস।
উপজেলা
বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ভিপি মো. কামাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পাকুন্দিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা
(ওসি) এস এম আরিফুর রহমান, উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক তৌফিকুল ইসলাম, যুগ্ম
আহ্বায়ক আতিকুর রহমান মাসুদ এবং পৌর বিএনপির সভাপতি এসএএম মিনহাজ উদ্দিন।

