সিঁদুরই হয়ে থাকল বৃষ্টির অসমাপ্ত জীবনের নিঃশব্দ সাক্ষী
নিজস্ব সংবাদদাতা
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম
বৃষ্টি ঘরামীর শেষ ইচ্ছা পূরণে মরদেহে সিঁদুর পরিয়ে তাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন হবু বর সবুজ মন্ডল -সংগৃহীত
যে সিঁদুরে নতুন জীবনের শুরু হওয়ার কথা ছিল, সেই সিঁদুরই শেষ পর্যন্ত পরানো হলো বৃষ্টির নিথর কপালে। বিয়ের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি—শাড়ি, গহনা, সিঁদুর সবই কেনা হয়েছিল। অপেক্ষা ছিল শুধু সেই মাহেন্দ্রক্ষণের, যখন বিয়ের পিঁড়িতে বসবেন বৃষ্টি ঘরামী। প্রিয় মানুষটির হাত ধরে শুরু হবে নতুন জীবন। কিন্তু তার আগেই ডেঙ্গু কেড়ে নিল প্রাণ। জীবনের সঙ্গী হওয়ার কথা ছিল যিনি, সেই হবু বরই শেষ বিদায়ের আগে সিঁদুর পরিয়ে দিলেন বৃষ্টিকে। অপূর্ণ থেকে গেল বিয়ের আয়োজন, পূরণ হলো সে স্বপ্ন। এক অসমাপ্ত জীবনের শেষ ইচ্ছা পূরণে নিথর মরদেহে সিঁদুর পরিয়ে তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিলেন হবু বর সবুজ মন্ডল। একইসাথে সেই বিয়ের জন্য কেনা শাড়ি-গহনা আর সিঁদুরই হয়ে থাকল এক অসমাপ্ত জীবনের নিঃশব্দ সাক্ষী।
বৃষ্টি
ঘরামী গোপালগঞ্জ নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কলেজের ২০২০-২০২১ ব্যাচের ছাত্রী ছিলেন।
তার বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার সাদিল্লাপুর ইউনিয়নের নৈয়ারবাড়ি গ্রামে।
ঢাকার
শ্যামলীতে একটি ট্রমা সেন্টারে নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন বৃষ্টি। সেখানে প্রায় নয়
মাস ধরে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি।
পরিবারের
ভাষ্য, আগামী ১৬ অক্টোবর ছিল বৃষ্টির বিয়ের দিন। তার জমজ বোন বন্যা ঘরামীরও একই সময়ে
বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। দুই বোনকে ঘিরেই পরিবারে চলছিল আনন্দের প্রস্তুতি। কিন্তু আনন্দের
সেই ঘরে হঠাৎ নেমে আসে শোকের ছায়া।
বৃষ্টির
মৃত্যুর পর রবিবার তার সিঁদুর পরা মরদেহের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ছবিটি দেখে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
বৃষ্টির
ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ঘেঁটে দেখা যায়, মৃত্যুর দিন সকালেও তিনি বি নেগেটিভ রক্তের প্রয়োজনের
কথা জানিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। সঙ্গে দিয়েছিলেন একটি মোবাইল নম্বর। রক্তদাতাদের
এগিয়ে আসার অনুরোধও করেছিলেন। কিন্তু সেই আহ্বানের পর আর ফিরে আসা হয়নি তার।
বৃষ্টির
ফেসবুকে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করা হলে ফোন ধরেন তার বড় বোন মেঘলা ঘরামী। বোন হারানোর
শোকে ভারাক্রান্ত কণ্ঠে তিনি বলেন,বৃষ্টি আমার বোন। আমার বোন আর নাই। ১৬ অক্টোবর বিয়ের
দিন ছিল। সব কেনাকাটা শেষ। ডেঙ্গু বোনটাকে কেড়ে নিল।
বৃষ্টির
অসুস্থতার বর্ণনা দিতে গিয়ে মেঘলা বলেন, তার ১০৮ ডিগ্রি পর্যন্ত জ্বর উঠেছিল। পরে হিট
স্ট্রোক হয়। চিকিৎসার ব্যবস্থাপনা আরও আগে শুরু হলে হয়তো বোনকে বাঁচানো সম্ভব হতো—এমন
আক্ষেপও করেন তিনি।
বিয়ের
জন্য যে সিঁদুর কিনে রাখা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই সিঁদুরই পরানো হলো বৃষ্টির নিথর
কপালে। মেঘলা ঘরামী বলেন, বোনজামাই ওকে সিঁদুর পরিয়ে দিয়েছে। ঢাকা থেকে মরদেহ নিয়ে
আসার পথে ওর হবু শ্বশুর-শাশুড়ি বিয়ের সব জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে আসেন।
বৃষ্টি
ও বন্যা—জমজ দুই বোন। একই সময়ে তাদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল।
তাই দুই মেয়ের বিয়েকে ঘিরে পরিবারের আনন্দও ছিল দ্বিগুণ। কিন্তু সেই আনন্দের মাঝেই
বৃষ্টির চলে যাওয়া যেন পুরো আয়োজনকে থামিয়ে দিয়েছে।
একদিকে
বোন বন্যার নতুন জীবনের প্রস্তুতি, অন্যদিকে বৃষ্টির নিথর দেহ—একই
পরিবারের জন্য এমন বৈপরীত্যের মুহূর্ত কতটা কঠিন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। বিয়ের
পোশাক, গহনা, সিঁদুর—সবই রয়ে গেল। রয়ে গেল বিয়ের তারিখও। শুধু নেই
বৃষ্টি।
একটি
মেয়ের বিয়ে মানেই নতুন জীবনের স্বপ্ন। বৃষ্টির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। বিয়ের
কেনাকাটা শেষ হয়েছিল, দিনক্ষণ ঠিক হয়েছিল, প্রিয় মানুষটির সঙ্গে ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্নও
ছিল। কিন্তু জীবনের হিসাব কখনো কখনো এমন নির্মম হয়ে ওঠে, যেখানে সব আয়োজন থেকেও শেষ
পর্যন্ত অনুপস্থিত থাকে মানুষটি।
বৃষ্টির
বিয়ের পিঁড়ি আর বসা হলো না। বাজল না বিয়ের সানাই। নতুন শাড়িতে সাজলেন না তিনি। প্রিয়
মানুষের হাতে বিয়ের আংটিও পরা হলো না। শুধু শেষ বিদায়ের আগে হবু বর তার সিঁথিতে পরিয়ে
দিলেন সিঁদুর। অপূর্ণ রয়ে গেল একটি বিয়ে। অপূর্ণ রয়ে গেল নতুন সংসারের স্বপ্ন। আর পরিবারের
কাছে বৃষ্টির সিঁদুর পরা সেই শেষ ছবিটি হয়ে থাকল—একটি বিয়ে, যা
হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়ে রইল শুধু এক বেদনাবিধুর স্মৃতি।

