Logo
Logo
×

সারাদেশ

‘গার্ড অব অনার’ ছাড়াই বীর মুক্তিযোদ্ধার দাফন

সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া যায় না অজুহাত ইউএনওর

Icon

কুমিল্লা (দক্ষিণ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১০:১০ পিএম

‘গার্ড অব অনার’ ছাড়াই বীর মুক্তিযোদ্ধার দাফন

ছবি-সংগৃহীত

৯ মাস অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার (৭৮)। কিন্তু জীবনের শেষ বিদায়ে রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘গার্ড অব অনার’ ছাড়াই তাঁকে দাফন করতে হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে উপজেলা প্রশাসনের কাউকে উপস্থিত না পাওয়া এবং সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া যায় না—এমন অজুহাতে রাষ্ট্রীয় সম্মানের ব্যবস্থা করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনেরা। এ ঘটনায় কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার। তিনি ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের মহালক্ষ্মীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। কর্মজীবনে যোগাযোগ ও আইন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পালন করে জীবনের শেষ দিনগুলো ছেলের সঙ্গে ঢাকায় কাটাচ্ছিলেন তিনি।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ঢাকায় প্রথম জানাজা শেষে বৃহস্পতিবার বিকেলে তাঁর মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে মরদেহ গ্রামে পৌঁছালে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা হিসেবে গার্ড অব অনারের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন স্বজন ও স্থানীয়রা। কিন্তু দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও উপজেলা প্রশাসনের কোনো প্রতিনিধি সেখানে উপস্থিত হননি। একপর্যায়ে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ছাড়াই তাঁকে দাফন করতে বাধ্য হন পরিবারের সদস্যরা।

স্বজনদের অভিযোগ, বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুন্না ইসলামকে একাধিকবার জানানো হয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে রাত হয়ে যাওয়ার কারণে গার্ড অব অনার দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানানো হয়।

বীর মুক্তিযোদ্ধার ভাই শাহজাহান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘চেয়েছিলাম ভাইকে শেষ সম্মানটুকু জানিয়ে চিরবিদায় দিতে। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। ৯ মাস অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে এই দেশকে স্বাধীন করল, অথচ সে তার প্রাপ্য সম্মানটুকুও পেল না।’

স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার মোল্লা বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া না গেলেও অন্তত প্রশাসনের লোক এসে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে যেতে পারত। কিন্তু তা-ও করা হয়নি। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সহযোদ্ধার এমন অমর্যাদা সহ্য করার মতো নয়।’

জানাজায় অংশ নেওয়া সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জহিরুল হক বলেন, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে ‘গার্ড অব অনার’ না দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।

তবে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো ‘গাফিলতি’ ছিল না দাবি করে ব্রাহ্মণপাড়া থানার ওসি মো. ফারুক হোসেন বলেন, গার্ড অব অনার দেওয়ার জন্য পুলিশ পাঠিয়েছিলাম। পুলিশ লাইন থেকে বিউগলের সুর বাজানোর জন্য দলও এসেছিল। তবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেউ উপস্থিত না থাকায় পুলিশ একা গার্ড অব অনার দিতে পারেনি।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুন্নী ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

কুমিল্লা জেলা প্রশাসক রোজি আকতার বলেন, ওই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে কেন গার্ড অব অনার দেওয়া হয়নি, কেন তার বাড়িতে গিয়ে সহানুভূতি প্রকাশ করা হয়নি, এ বিষয়ে লিখিত জবাব চাওয়া হয়েছে ব্রাহ্মণপাড়ার ইউএনওর কাছে। বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারকেও। লিখিত জবাব পেলে তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান প্রদর্শন আদেশ ২০২০ অনুযায়ী, মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধার কফিন জাতীয় পতাকা দিয়ে আবৃত করতে হবে। সমাধিস্থ করার আগে জাতীয় পতাকা সরিয়ে নিতে হবে। সরকারের অনুমোদিত প্রতিনিধি কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। পাশাপাশি অনুমোদিতসংখ্যক পুলিশ সদস্যের মাধ্যমে সশস্ত্র সালাম প্রদান এবং বিউগলে করুণ সুর বাজানোর বিধান রয়েছে।

আদেশ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গার্ড অব অনার পরিচালনা করবেন। তিনি রাষ্ট্রীয় বা জনগুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত থাকলে থানার পরবর্তী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ দায়িত্ব পালন করবেন। সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর নিজস্ব রীতি অনুসরণ করতে হবে।

এ ছাড়া বীর মুক্তিযোদ্ধার অন্তিম ইচ্ছা ও ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সৎকার বা সমাধিস্থ করার নির্দেশনা রয়েছে। অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ থেকে অনুদান দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

প্রধান সম্পাদক- আ.ত.ম. শামসুজ্জামান

ইশা ফাউন্ডেশন’র একটি প্রকাশনা

অনুসরণ করুন