বরিশাল মহাশ্মশানে প্রদীপের আলোয় প্রয়াত স্বজনদের স্মরণ
বরিশাল সংবাদদাতা
প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৪৭ পিএম
মোমবাতি ও প্রদীপের আলোয় আলোকিত বরিশালের ঐতিহ্যবাহী মহাশ্মশান। ফুলে ফুলে সাজানো হয়েছে প্রয়াত স্বজনদের সমাধি। কোথাও চলছে প্রার্থনা ও নামকীর্তন, কোথাও প্রিয়জনের সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে স্মৃতিচারণ করছেন স্বজনেরা। পূর্বপুরুষ ও প্রয়াত আত্মীয়-স্বজনদের স্মরণে প্রতিবছরের মতো এবারও বরিশালে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী শ্মশান দীপাবলি উৎসব।
শনিবার (৭ নভেম্বর) সন্ধ্যায় নগরীর কাউনিয়া এলাকার বরিশাল মহাশ্মশানে শুরু হয় এ উৎসব। রাত গভীর হওয়া পর্যন্ত চলে নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। এতে দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও ভারত ও নেপালসহ বিভিন্ন স্থান থেকে হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে।
প্রায় ছয় একর জমির ওপর বিস্তৃত পশ্চিম কাউনিয়া ও নতুন বাজার এলাকার এই মহাশ্মশান প্রায় দুইশ বছরের পুরোনো। এখানে রয়েছে ৭০ হাজারের বেশি মঠ। আয়তন ও মঠের সংখ্যার কারণে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মহাশ্মশান হিসেবে পরিচিত। ১৯২৭ সাল থেকে এখানে শ্মশান দীপাবলি উদযাপিত হয়ে আসছে। কালীপূজার আগের দিন ভূত চতুর্দশীর পুণ্য তিথিতে প্রতিবছর এ আয়োজন করা হয়।
উৎসব উপলক্ষে স্বজনেরা প্রয়াত ব্যক্তিদের সমাধিতে প্রদীপ, মোমবাতি ও ধূপ জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা জানান। ফুল দিয়ে সাজিয়ে তোলেন সমাধি। অনেকে প্রয়াত স্বজনের জীবদ্দশায় পছন্দের খাবারও নিয়ে আসেন। ইলিশ মাছ, পায়েসসহ নানা খাবার সমাধিতে নিবেদন করেন তাঁরা। সন্ধ্যা নামতেই হাজারো প্রদীপের আলোয় উৎসবমুখর হয়ে ওঠে পুরো মহাশ্মশান। তবে আনন্দের পাশাপাশি অনেকের চোখে ছিল স্বজন হারানোর বেদনা।
ঐতিহাসিক গুরুত্বের দিক থেকেও বরিশাল মহাশ্মশানের রয়েছে বিশেষ পরিচিতি। এখানে সমাহিত রয়েছেন কবি জীবনানন্দ দাশের বাবা সত্যানন্দ দাশ ও পিতামহ সর্বানন্দ দাশ। এ ছাড়া ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ, কালিচন্দ্র ঘোষ ও মনোরমা বসু মাসিমাসহ বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তির শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে এখানে। রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক অশ্বিনী কুমার দত্তের চিতাভস্মও সংরক্ষিত রয়েছে এই মহাশ্মশানে।
উৎসবে আসা জয়দেব সাহা বলেন, প্রয়াত আত্মীয়-স্বজনের আত্মার শান্তি কামনা ও তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রতিবছর এখানে আসেন তাঁরা। জীবিত অবস্থায় প্রিয়জন যেসব খাবার পছন্দ করতেন, সেসব খাবারও সমাধিতে নিবেদন করেন। উজ্জ্বল দাস বলেন, দীপাবলি উপলক্ষে আগে থেকেই সমাধি পরিষ্কার ও রং করানো হয়েছে। উৎসবের দিন মোমবাতি ও প্রদীপ দিয়ে সাজানো হয়। যেসব সমাধিতে স্বজনেরা আসেন না, সেখানেও তিনি প্রদীপ জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
বরিশাল মহাশ্মশান রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজয় ভক্ত বলেন, বিকেল থেকেই দর্শনার্থীদের সমাগম শুরু হয়। তাঁদের নিরাপত্তায় স্বেচ্ছাসেবকেরা দায়িত্ব পালন করছেন। মহাশ্মশান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার পাশাপাশি সিসি ক্যামেরা ও আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) সুশান্ত সরকার বলেন, উৎসবের নিরাপত্তায় প্রায় ৩০০ পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি সাদাপোশাকে পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও এসআরবি-৮-এর সদস্যরা নজরদারি করছেন। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় ফুট প্যাট্রোলও পরিচালনা করা হচ্ছে।

