কারাগার থেকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে:
তারেক রহমানের ১৯তম কারামুক্তি দিবস আজ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:১৬ পিএম
ছবি-সংগৃহীত
একটি গ্রেপ্তার বদলে দিয়েছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গতিপথ। ২০০৭ সালের ৭ মার্চ ভোররাতে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান। ১/১১-এর রাজনৈতিক অস্থিরতার সেই সময়ে শুরু হয়েছিল তাঁর ৫৫৪ দিনের কারাবন্দিত্ব। আজ, ৩ সেপ্টেম্বর, সেই কারামুক্তির ১৯তম বার্ষিকী—আর ইতিহাসের পরিহাস কিংবা রাজনৈতিক উত্থানের এক নাটকীয় বাঁক হিসেবে, সেই বন্দিজীবন পেরিয়ে আজ তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
কারামুক্তির দিনটি এবার বিএনপির কাছে শুধু অতীত স্মরণের উপলক্ষ নয়; বরং দলটির রাজনৈতিক বয়ানে এটি দীর্ঘ প্রতিকূলতা অতিক্রম করে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে আসার প্রতীক।
২০০৭ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর বিভিন্ন মামলায় তাঁকে কারাবন্দি রাখা হয়। বিএনপির অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ হিসেবেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং কারাবন্দি অবস্থায় রিমান্ডের নামে তাঁর ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়।
দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, নির্যাতনের কারণে তাঁর শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি ঘটে। একপর্যায়ে অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে রাজধানীর তৎকালীন পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
দীর্ঘ ৫৫৪ দিন কারাবন্দি থাকার পর ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পান তারেক রহমান। দিনটি এরপর থেকেই বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর কাছে ‘কারামুক্তি দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
কারাগার থেকে মুক্তি পেলেও শেষ হয়নি তাঁর রাজনৈতিক ও আইনি লড়াই। বিভিন্ন মামলায় জামিন পাওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য ২০০৮ সালে উচ্চ আদালতের নির্দেশে তাঁকে লন্ডনে নেওয়া হয়। স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও একমাত্র কন্যা জাইমা রহমান তাঁর সঙ্গে লন্ডনে যান।
এরপর কেটে যায় দীর্ঘ সময়। দেশের রাজনীতি থেকে ভৌগোলিকভাবে দূরে থাকলেও বিএনপির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর প্রভাব ক্রমেই বাড়তে থাকে। দলের নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে উঠে এসে একপর্যায়ে বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন তিনি।
দীর্ঘ প্রবাসজীবনের অবসান ঘটিয়ে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। তাঁর প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক রাজনৈতিক উচ্ছ্বাস তৈরি হয়।
এর পরের অধ্যায় আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। জনগণের রায় নিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
ফলে ২০০৭ সালের সেই গ্রেপ্তার থেকে ২০২৬ সালের সরকারপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ—প্রায় দুই দশকের এই রাজনৈতিক যাত্রা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতির অন্যতম আলোচিত অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।
বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে তারেক রহমানের কারামুক্তি দিবস বরাবরই রাজনৈতিক নিপীড়ন ও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দলের সংগ্রামের প্রতীক। তবে এবার সেই স্মরণে যুক্ত হয়েছে নতুন বাস্তবতা। যে নেতাকে ১৯ বছর আগে কারাগারে যেতে হয়েছিল, তিনিই এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে।
দলের নেতারা মনে করেন, ১/১১-এর সময়কার গ্রেপ্তার ও কারাবাস তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় বাঁক। তাঁদের দাবি, প্রতিকূলতা ও দীর্ঘ প্রবাসজীবন তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল না করে বরং দলের নেতৃত্বে তাঁর অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষণে তাঁর এই দীর্ঘ পথচলাকে দেখা হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতির ধারাবাহিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে—যেখানে একজন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা কারাবন্দিত্ব, চিকিৎসা, প্রবাস এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছেন।
আজকের ১৯তম কারামুক্তি দিবসে তাই তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের দুই প্রান্ত যেন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে—এক প্রান্তে ২০০৭ সালের কারাগারের দরজা, অন্য প্রান্তে ২০২৬ সালের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর।
১৯ বছর আগে যে দিনটি ছিল কারাগার থেকে মুক্তির দিন, আজ সেই দিনটিই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক দীর্ঘ প্রত্যাবর্তনের প্রতীক।

