Logo
Logo
×

জাতীয়

প্রতিমন্ত্রী ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ দিলেন প্রধানমন্ত্রী

Icon

সমাচার প্রতিদিন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩০ পিএম

প্রতিমন্ত্রী ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ দিলেন প্রধানমন্ত্রী

ছবি-সংগৃহীত

অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে নেমে বিতর্কের মুখে পড়া মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রবিবার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে তাঁকে ডেকে নিয়ে এ নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারসংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের হাতেও অস্ত্র দেখা যায়। অভিযানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। বিষয়টি নিয়ে বিএনপি ও সরকারের ভেতরেও অসন্তোষ তৈরি হয়। দল ও সরকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনায় আপত্তি না থাকলেও একজন প্রতিমন্ত্রীর নিজে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে অভিযানে নামা গ্রহণযোগ্য নয়। মাদক দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সক্রিয় করার পরিবর্তে কেন তিনি নিজেই অস্ত্র হাতে মাঠে নেমেছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

এদিকে শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর ১৩টি স্থান আকস্মিক পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি আবাসিক এলাকার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং সেবার মান উন্নয়নে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেন তিনি। এমনকি কোথাও কোথাও পরিস্থিতির উন্নয়নে সময়সীমাও বেঁধে দেন। প্রধানমন্ত্রীর এসব কার্যক্রমের দিন বিকেলেই ইশরাকের অস্ত্র হাতে অভিযানের ঘটনা ঘটে। এতে প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক উদ্যোগের আলোচনা অনেকটাই আড়ালে পড়ে যায় বলে মনে করছেন দল ও সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

শনিবার বিকেলে রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুন্টিঘর রেলগেট এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে যান ইশরাক হোসেন। তাঁর নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে তিনি চিৎকার করে বলছেন, ‘এই ধর ধর ধর...।’ এ সময় তাঁর পাশ থেকে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘একেবারে গুলি করে দেব।’

ভিডিওতে আরও দেখা যায়, প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা নিরাপত্তাকর্মীরা কয়েকজনকে ধরতে দৌড়াচ্ছেন। তাঁদের একজন এক তরুণকে লাথি মারেন। এ সময় কয়েকজনকে নিজেদের নির্দোষ দাবি করতে শোনা যায়। পরবর্তী সময়ে আটক ব্যক্তিদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার দৃশ্যও ভিডিওতে দেখা যায়।

ঘটনাস্থলে ইশরাকের ব্যক্তিগতভাবে নিয়োগ দেওয়া দুই দেহরক্ষী তোফাজ্জল হোসেন ও লাভলুর পাশাপাশি একজন সরকারি দেহরক্ষীও উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের হাতেও অস্ত্র ছিল। ভিডিওর কিছু অংশে ইশরাকের হাতে থাকা পিস্তল অস্পষ্ট করা হলেও অন্য অংশে সেটি স্পষ্ট দেখা যায়।

ঘটনার পর একজন প্রতিমন্ত্রী এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করে অভিযান পরিচালনা করতে পারেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালার ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আত্মরক্ষার জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র বহন ও ব্যবহার করা গেলেও অন্যের মনে ভয় বা বিরক্তির সৃষ্টি হতে পারে, এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না।

ইশরাকের অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। রবিবার ডিএমপির গণমাধ্যম কেন্দ্রে সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অস্ত্রকাণ্ড নিয়ে সমালোচনার মধ্যে রবিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বিবৃতি দিয়ে ইশরাক হোসেন দাবি করেন, মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিতেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। পুলিশ, স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতাদের যৌথ সিদ্ধান্তে এ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল।

ইশরাকের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকা-৬ আসনের গেন্ডারিয়া এলাকার বিভিন্ন স্থানে মাদক কারবারের অভিযোগ পেয়ে তিনি আগে থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। জনবলসংকট দূর করা এবং মাদকের আস্তানার কাছে স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের উদ্যোগও নিয়েছিলেন। তবে সমস্যার সমাধান হয়নি।

বিবৃতিতে তিনি আরও দাবি করেন, অভিযানের আগে খবর পেয়েছিলেন যে মাদক কারবারিরা ছাদ থেকে গুলি চালাতে পারে। একটি অস্থায়ী মাদকের আস্তানার কাছে পৌঁছানোর পর ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি হইচই করে তাঁদের গাড়িবহরের দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন। সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় নিজের ও অন্যদের নিরাপত্তার জন্য তিনি এবং তাঁর সরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা অল্প সময়ের জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। নিজের হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রটি বৈধ ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত দাবি করে ইশরাক বলেন, আত্মরক্ষার জন্যই তিনি অস্ত্র প্রদর্শন করেছিলেন। এতে আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।

বিবৃতিতে ইশরাক দাবি করেন, অভিযানে চার থেকে পাঁচটি অস্থায়ী মাদকের আস্তানা উচ্ছেদ করা হয়েছে। এসব স্থান থেকে মাদকদ্রব্য, অস্ত্র, নগদ অর্থ ও ছিনতাই করা মুঠোফোন জব্দ করা হয়। এ ছাড়া ছয়জনকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। এসব তথ্য উপেক্ষা করে কয়েকটি গণমাধ্যম ঘটনার খণ্ডিত চিত্র তুলে ধরেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে মাদকবিরোধী কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন প্রতিমন্ত্রী।

তবে অভিযান শুরুর আগে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শনিবার ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মাসুদ রানা সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, প্রতিমন্ত্রী আগে থেকে পুলিশকে বিষয়টি জানাননি। পরে তাঁরা ঘটনাটি জানতে পারেন। অন্যদিকে, ইশরাকও শনিবার সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ঘটনাস্থলে যাওয়ার প্রায় ১০ মিনিট পর পুলিশকে সেখানে আসতে বলেন তিনি।

সব মিলিয়ে অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানের ঘটনায় সৃষ্ট বিতর্কের এক দিনের মাথায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পদত্যাগের নির্দেশ সরকারের ভেতরে জবাবদিহি ও দায়িত্বশীল আচরণের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।

প্রধান সম্পাদক- আ.ত.ম. শামসুজ্জামান

ইশা ফাউন্ডেশন’র একটি প্রকাশনা

অনুসরণ করুন