Logo
Logo
×

মতামত

সড়ক পরিবহণ ও যোগাযোগ খাত নিয়ে করণীয়, বাস্তবতা

Icon

এটিএম শামসুজ্জামান

প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০২৫, ০৯:০৯ পিএম

সড়ক পরিবহণ ও যোগাযোগ খাত নিয়ে করণীয়, বাস্তবতা

সড়ক পরিবহণ ও যোগাযোগ খাত একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জনসাধারণের জীবনমান, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বাংলাদেশে এই খাত দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায়—একদিকে অবকাঠামো উন্নয়ন, অন্যদিকে দুর্ঘটনা, যানজট, দুর্নীতি, অনিয়ম ও নীতিগত সীমাবদ্ধতা। তাই এ খাতে কাজ করা সাংবাদিকদের ভূমিকা কেবল সংবাদ সরবরাহেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তারা নীতি নির্ধারণে প্রভাব, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।

এই খাতে কাজ করা সাংবাদিকের করণীয় এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার ভিত্তিতে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় বলা যায় কয়েকটি বিষয়কে স্বরণে রেখে সাংবাদিকদের কাজ করতে হয়। যেমন-

১. তথ্য-উপাত্তভিত্তিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি

সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য, দুর্ঘটনার পেছনের কারণ, পুলিশ ও দমকলের রিপোর্ট, পরিবহণ মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নীতি, বিআরটিএ’র লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া—এসব বিষয়ে গভীর অনুসন্ধান জরুরি। সরকারি বাজেট, টেন্ডার, প্রকল্প বাস্তবায়ন, সড়ক নির্মাণ মান এবং তা রক্ষণাবেক্ষণে অনিয়ম থাকলে তার প্রমাণসহ সংবাদ তৈরি করা দরকার।

২. সরেজমিন পর্যবেক্ষণ

রুট পরিদর্শন, বাস-ট্রাক স্ট্যান্ড, মহাসড়ক, ব্রিজ-ফ্লাইওভার এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা তথ্যকে আরও নির্ভরযোগ্য করে। চালকদের সঙ্গে কথা বলা, যাত্রীদের অভিজ্ঞতা শোনা এবং স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য নেওয়া—সব মিলিয়ে প্রতিবেদনে বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়।

৩. প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য রক্ষা

পরিবহণ মালিক, শ্রমিক, যাত্রী, পুলিশ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (RHD), বিআরটিএ, স্থানীয় প্রশাসন—সকল পক্ষের বক্তব্য নিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিবেদন তৈরি করা সাংবাদিকের পেশাগত দায়িত্ব।

৪. নীতিবিষয়ক প্রতিবেদন ও জনসচেতনতামূলক লেখা

সড়ক নিরাপত্তা নীতি, আইন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা উচিত। হেলমেট ব্যবহার, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, ওভারটেকিং, মাদকাসক্ত চালক, রাতের বেলা অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো—এসব বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রতিবেদন জনকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ।

৫. মানচিত্র, তথ্যচিত্র ও ডেটা জার্নালিজম

রোড অ্যাকসিডেন্ট ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন, যাত্রী ও যানবাহনের প্রবাহ বিশ্লেষণ, জ্যাম প্যাটার্ন ইত্যাদি গ্রাফ বা মানচিত্রে উপস্থাপন করলে পাঠকের কাছে তথ্য আরও স্পষ্ট হয়।

মাঠপর্যায়ে সাংবাদিকের বাস্তবতায় খেয়াল রাখতে হয়

১. তথ্য-প্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা

বিআরটিএ, পুলিশ বা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অনেক তথ্য সহজলভ্য নয়। দুর্ঘটনার সঠিক পরিসংখ্যান বহু ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ বা অসঙ্গতিপূর্ণ থাকে। অনেক সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তথ্য গোপন বা আংশিক সরবরাহ করে।

২. স্টেকহোল্ডারদের চাপ ও ঝুঁকি

পরিবহণ মালিক-শ্রমিক সংগঠনের চাপ, হুমকি বা অসহযোগিতা সাংবাদিকদের জন্য নতুন নয়। সড়ক দুর্ঘটনার পেছনের শক্তিশালী ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক স্বার্থ থাকায় অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ঝুঁকি বেড়ে যায়।

৩. মাঠপর্যায়ের শারীরিক ঝুঁকি

দুর্ঘটনাস্থলে যেতে গিয়ে সাংবাদিক অনেক সময় নিজেও বিপদে পড়েন—সড়কে নিরাপত্তাহীনতা, জনসমাগম, উত্তেজনা ইত্যাদি পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। দীর্ঘসময় যানজটে থেকে কাভারেজ করতে হয়, অনেক সময় দূরদূরান্তে পা চালিয়ে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়।

৪. প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা

অনেক সময় উন্নত ক্যামেরা, জিপিএস ট্র্যাকিং, ড্রোন বা ডেটা সংগ্রহের সফটওয়্যার না থাকায় প্রতিবেদন আরও সমৃদ্ধ করা কঠিন হয়ে ওঠে।

৫. নৈতিকতা ও পেশাগত চাপ

দ্রুত রিপোর্ট প্রকাশের চাপ সাংবাদিককে কখনও কখনও যাচাই ছাড়া তথ্য প্রকাশে বাধ্য করে। কিন্তু এই খাতে ভুল তথ্য গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে—জনমনে আতঙ্ক তৈরি, অভিযোগের ভুল ব্যাখ্যা, বা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি।

এসব দিকের বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও করণীয়র দিকে খেয়াল রাখতে হলে যেসব দিক প্রথমেই সামনে চলে আসে তাহলো—

১. ডেটা-ভিত্তিক সাংবাদিকতার প্রসার

সড়ক দুর্ঘটনার স্বয়ংক্রিয় ডেটাবেজ ব্যবহার, ট্রাফিক সিস্টেমের সেন্সর ডেটা, গুগল ম্যাপ বা ওপেনস্ট্রিটম্যাপ-ভিত্তিক বিশ্লেষণ সাংবাদিকতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করছে।

২. সহযোগিতামূলক সাংবাদিকতা

ভিন্ন ভিন্ন গণমাধ্যম এক হয়ে দুর্ঘটনা, নির্মাণ প্রকল্প বা পরিবহণ দুর্নীতির যৌথ তদন্ত করতে পারে।

৩. নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে সংযোগ বৃদ্ধি

উন্নয়ন প্রকল্প, সড়ক আইন, পরিবহণ খাতের ডিজিটালাইজেশন—এসব বিষয়ে সাংবাদিকের নিয়মিত রিপোর্ট policymakers-কে জবাবদিহিতে বাধ্য করতে পারে।

৪. নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ

মাঠপর্যায়ে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট, ডিজিটাল সিকিউরিটি—এসব বিষয়ে সাংবাদিকের বিশেষ প্রশিক্ষণ জরুরি।

এসব সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষনে নিশ্চিতভাবে এটুকু বলাই যায়, সড়ক পরিবহণ ও যোগাযোগ খাত নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকরা দেশের জনসাধারণের নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও নীতি সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এই খাতে তাদের দায়িত্ব অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার বিশাল সুযোগ আছে। তথ্য-উপাত্তনির্ভর, নিরপেক্ষ ও সাহসী সাংবাদিকতা যেমন সত্যকে সামনে আনে, তেমনি একটি সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও কার্যকর পরিবহণ ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করতেও বড় ভূমিকা রাখে।

প্রধান সম্পাদক- আ.ত.ম. শামসুজ্জামান

ইশা ফাউন্ডেশন’র একটি প্রকাশনা

অনুসরণ করুন