Logo
Logo
×

মতামত

পরিবেশ ধ্বংসের মহোৎসবে নোটিশ-জরিমানায় সীমাবদ্ধ প্রশাসন

Icon

এটিএম শামসুজ্জামান

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৫ পিএম

পরিবেশ ধ্বংসের মহোৎসবে নোটিশ-জরিমানায় সীমাবদ্ধ প্রশাসন

ছবি-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন এলাকা। একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে সমুদ্রসৈকত—প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই অনন্য সমন্বয় পর্যটকদের কাছে এলাকাটিকে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। কিন্তু অপরিকল্পিত পর্যটন স্থাপনা, পরিবেশবিধি লঙ্ঘন এবং প্রশাসনিক দুর্বলতায় ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে এই উপকূলীয় পরিবেশ। মেরিন ড্রাইভে পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়েছে ১৯৯৯ সালে। অথচ তিন দশকের কাছাকাছি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই সংরক্ষিত এলাকায় একের পর এক গড়ে উঠছে রিসোর্ট, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না থাকা এবং নানা অনিয়মের অভিযোগে ২৬টি রিসোর্ট ও ১০টি রেস্টুরেন্টকে নোটিশ, ১৪টি রিসোর্টকে জরিমানা এবং দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, পরিবেশ রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কেউ কেউ রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ তুলছেন। এ অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু প্রশাসনিক অদক্ষতার বিষয় নয়, বরং পরিবেশ আইন প্রয়োগের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলে। টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের প্রাণহানি এই প্রশাসনিক দুর্বলতা ও নজরদারির ঘাটতিকে আরও নির্মমভাবে সামনে এনেছে। প্রশ্ন উঠেছে—পরিবেশ রক্ষার আইন, নোটিশ ও জরিমানা যদি অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করতে না পারে, তবে মেরিন ড্রাইভের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব নেবে কে?

কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত ও আশপাশের উপকূলীয় এলাকা ১৯৯৯ সালে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল জীববৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও উপকূলীয় প্রতিবেশব্যবস্থা রক্ষা করা। অথচ সেই সংরক্ষিত এলাকাতেই একের পর এক রিসোর্ট, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে। কোথাও অনুমোদনহীন ভবন নির্মাণ, কোথাও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, আবার কোথাও পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই পর্যটন ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ সামনে এসেছে।

ইসিএ এলাকায় একের পর এক রিসোর্ট-রেস্টুরেন্ট নির্মাণ, ২৬ রিসোর্ট ও ১০ রেস্টুরেন্টকে নোটিশ, ১৪ রিসোর্টকে জরিমানা, দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা; এরপরও থামছে না পরিবেশবিধি লঙ্ঘন। টুপটুপ রিসোর্টে ১০ পর্যটকের প্রাণহানির ঘটনা প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রশ্নকে আরও সামনে এনেছে।

মেরিন ড্রাইভের পরিবেশ পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য রীতিমতো উদ্বেগজনক। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া রিসোর্ট ও রেস্টুরেন্ট পরিচালনার অভিযোগে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে বিভিন্ন সময়ে ২৬টি রিসোর্ট ও ১০টি রেস্টুরেন্টকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নোটিশ অমান্য করায় ১৪টি রিসোর্টকে জরিমানা করা হয়েছে। দুটি রিসোর্টের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। অথচ বাকি ১০টি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়া হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, একই এলাকায় পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে কোনো প্রতিষ্ঠান জরিমানা দিচ্ছে, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে, আবার কোনো প্রতিষ্ঠান নোটিশ পেয়েও নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে—এ কেমন প্রশাসনিক ব্যবস্থা? আইন কি সবার জন্য সমান, নাকি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা কোনো নিয়ম রয়েছে?

১৯৯৯ সালে সরকার কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত-সংলগ্ন এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে। উদ্দেশ্য ছিল উপকূলীয় পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক ভারসাম্য এবং সমুদ্রসৈকতের প্রতিবেশ রক্ষা করা।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ৫ ধারায় প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা এবং এসব এলাকার পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ বিধিনিষেধ আরোপের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ ইসিএ এলাকায় যেকোনো ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিবেশগত বিধিনিষেধ মেনে চলা বাধ্যতামূলক।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইসিএ ঘোষণা করার পরও কীভাবে একের পর এক রিসোর্ট, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠল? এসব স্থাপনা নির্মাণের সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী ছিল? নির্মাণের অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো কে দেখভাল করেছে?

আইন থাকার পরও যদি বছরের পর বছর পরিবেশবিধি লঙ্ঘন করে স্থাপনা নির্মাণ চলতে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিমানার আওতায় আসা ১৪টি রিসোর্টের কথা বলা হয়েছে। তবে প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে ১০টি প্রতিষ্ঠানের নাম ও জরিমানার পরিমাণ পাওয়া গেছে।

প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— ১. রামুর সাম্পান বিচ রিসোর্ট—১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ২. নিসর্গ হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট—৪ লাখ টাকা। ৩. উখিয়ার সি পার্লস বীচ রিসোর্ট—১ লাখ টাকা। ৪. টেকনাফের জাহাজপুরা ক্যাসল—১ লাখ ১ হাজার টাকা। ৫. উখিয়ার সি পার্ল বীচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা—৪ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। ৬. কলাতলীর জিডি সমুদ্র বিলাস—৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ৭. মায়াবী বীচ রিসোর্ট—১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ৮. টাইটান হোটেল—১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ৯. কলাতলীর হোটেল জানা ডাডা—২ লাখ টাকা। ১০. কলাতলীর হোটেল স্যুট সাদাফ—৩ লাখ টাকা।

প্রকাশিত এই ১০টি প্রতিষ্ঠানের জরিমানার মোট পরিমাণ ২৭ লাখ ৮ হাজার টাকা। তবে বাকি চারটি রিসোর্টের নাম, জরিমানার পরিমাণ এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জরিমানার সুনির্দিষ্ট তারিখ প্রকাশিত তথ্যে পাওয়া যায়নি।

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে—জরিমানা দেওয়ার পর এসব প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে কি না? বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হয়েছে কি না? নাকি জরিমানা দিয়ে আগের মতোই ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে? জরিমানা যদি পরিবেশবিধি লঙ্ঘন বন্ধ করতে না পারে, তাহলে সেই জরিমানার কার্যকারিতা নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে।

প্রতিবেদনে নোটিশপ্রাপ্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— হিমছড়ি এলাকার বে হিলকে। বে ফ্রেন্ডস রিসোর্ট। সাম্পান রিসোর্ট। মারমেইড ক্যাফে। আরনিম রিসোর্ট। ছুটি রিসোর্ট। হোটেল ইনানী লং বে। ওশান পার্ল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট। এ ছাড়া নাম উল্লেখ না করে নির্মাণাধীন তিনটি হোটেলকেও নোটিশ দেওয়ার তথ্য এসেছে।

তবে এটি ২৬টি রিসোর্ট ও ১০টি রেস্টুরেন্টের পূর্ণাঙ্গ তালিকা নয়। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম, অবস্থান, নোটিশের তারিখ এবং অভিযোগের ধরন প্রকাশ করা হয়নি।

জনস্বার্থে পরিবেশ অধিদপ্তরের উচিত ৩৬টি প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা। কোন প্রতিষ্ঠান পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া ব্যবসা করছে, কোন প্রতিষ্ঠান পাহাড় বা উপকূলীয় এলাকায় স্থাপনা নির্মাণ করেছে এবং কোন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—সব তথ্য জনগণের সামনে আসা প্রয়োজন।

মেরিন ড্রাইভের পরিবেশগত অনিয়ম ও প্রশাসনিক দুর্বলতার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হয়ে উঠেছে উখিয়ার পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্ট।

পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনা করায় গত এপ্রিল মাসে প্রতিষ্ঠানটিকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। নোটিশ অমান্য করায় ১৩ মে প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার অঞ্চলের পরিচালক জমির উদ্দিনে ভাষ্য, রিসোর্টটির পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত ভবনের নকশা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট—কোনোটিই ছিল না।

অন্যদিকে, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের ভাষ্য, টুপটুপ রিসোর্টের তাদের কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল না। প্রতিষ্ঠানটিকে আগে দুই দফায় স্থাপনা ভেঙে ফেলার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।

তবে বাস্তবতায় সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে ১৭ অক্টোবর ২০২৬। রিসোর্টটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয় এবং আরও কয়েকজন আহত হন। কাঠের অবকাঠামোয় তৈরি রিসোর্টটির বড় অংশ আগুনে পুড়ে যায়।

ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটির ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স ছিল না। আগে সতর্ক করা হলেও প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়নি। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রিসোর্টের মালিক ও ব্যবস্থাপকসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে উখিয়া থানায় মামলা হয়েছে।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—যে প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই, ভবনের অনুমোদন নেই, ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স নেই, তাকে একাধিকবার নোটিশ দেওয়ার পরও কার্যকরভাবে বন্ধ করা গেল না কেন? এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার প্রশ্ন নয়; সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়, নজরদারি ও জবাবদিহিরও বড় পরীক্ষা।

কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত প্রায় ৮০ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে দোকানপাটসহ প্রায় ১৫০টি অবৈধ হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের তালিকা তাদের কাছে রয়েছে।

অন্যদিকে, ১৭ অক্টোবর এক গণমাধ্যেমের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেরিন ড্রাইভের এক হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যাচাই করে আড়াই শতাধিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় অনুমোদনের ঘাটতি পাওয়া গেছে।

দুটি পরিসংখ্যানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কউকের চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী প্রায় ১৫০টি অবৈধ হোটেল-মোটেল-রিসোর্টের তালিকার কথা এসেছে। অন্যদিকে, অন্য প্রতিবেদনে বিভিন্ন সংস্থার যাচাইয়ে আড়াই শতাধিক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনগত ঘাটতির কথা বলা হয়েছে। দুটি তালিকার আওতা ও যাচাইয়ের মানদণ্ড এক কি না, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। তবে উভয় তথ্যই মেরিন ড্রাইভে প্রশাসনিক নজরদারির বড় ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।

কউক চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানগুলোকে বৈধতা নিশ্চিত করতে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময় পার হলে চূড়ান্ত নোটিশ এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনা আর বাস্তবায়ন এক বিষয় নয়। জনগণ এখন শুধু আশ্বাস নয়, দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চায়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নোটিশ অমান্য করায় দুটি রিসোর্টের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। কিন্তু প্রকাশিত সংবাদে মামলা দুটির নম্বর, কোন দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, কোন আইনের কোন ধারায় মামলা হয়েছে এবং সর্বশেষ আইনি অবস্থার বিস্তারিত পাওয়া যায়নি।

মামলা দায়েরের পর তদন্ত কতদূর এগিয়েছে, আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে কি না, অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো কার্যক্রম পরিচালনা করছে কি না—এসব তথ্য জনসমক্ষে আসা উচিত।

এখানে টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলাকে পরিবেশ অধিদপ্তরের আগের দুটি মামলার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। এগুলো পৃথক ঘটনা ও পৃথক আইনি প্রক্রিয়া।

২৬টি রিসোর্ট ও ১০টি রেস্টুরেন্টকে নোটিশ দেওয়ার পর ১৪টি রিসোর্টকে জরিমানা এবং দুটি রিসোর্টের বিরুদ্ধে মামলা করা হলেও বাকি ১০টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানগুলো কি পরিবেশগত ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেছে? তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান? নাকি প্রশাসনিক জটিলতা কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি? এসব প্রশ্নের উত্তর পরিবেশ অধিদপ্তরকেই দিতে হবে।

একই ধরনের অভিযোগে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জরিমানা ও মামলা হলে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো কেন ব্যবস্থা থেকে বাইরে থাকবে, তার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা থাকা জরুরি।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইসিএ এলাকায় নির্মিত রিসোর্ট বন্ধের উদ্যোগ নিতে গেলে তাদের নানা ধরনের রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হয়।

এ অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। কারণ পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা যদি রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারেন, তাহলে আইন বাস্তবায়নের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে।

তবে কোন রাজনৈতিক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী চাপ সৃষ্টি করেছে, কোন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটেছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা লিখিতভাবে কোনো অভিযোগ করেছেন কি না—এসব বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তাই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাব বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিবেশ আইনের আওতায় নোটিশ দেওয়া ও জরিমানা করার সুযোগ থাকলেও সব ক্ষেত্রে সরাসরি স্থাপনা উচ্ছেদ বা বন্ধ করার এখতিয়ার তাদের নেই। এ ক্ষেত্রে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থাৎ পরিবেশ অধিদপ্তর পরিবেশগত ছাড়পত্র ও বিধিনিষেধের বিষয়টি দেখছে, কউক ভবনের নকশা ও উন্নয়ন অনুমোদনের বিষয়টি দেখছে, আর ফায়ার সার্ভিস দেখছে অগ্নিনিরাপত্তা। কিন্তু সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকলে একটি প্রতিষ্ঠান একাধিক সংস্থার অনুমোদন ছাড়াই বছরের পর বছর ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে। টুপটুপ রিসোর্টের ঘটনা সেই সমন্বয়হীনতার ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

মেরিন ড্রাইভের পরিবেশগত সংকট শুধু রিসোর্ট নির্মাণ বা ব্যবসার অনুমোদনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, বনভূমি, জলাধার ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ভবিষ্যৎ। অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের ফলে পাহাড় কাটা, গাছপালা উজাড়, প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং অপরিশোধিত বর্জ্য সমুদ্রে মিশে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। রিসোর্ট ও রেস্টুরেন্ট থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হয়। যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকলে এসব বর্জ্য সৈকত, সমুদ্রের পানি ও আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ দূষিত করতে পারে।

এ ছাড়া অতিরিক্ত নির্মাণের ফলে উপকূলীয় এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি হয়। এর প্রভাব শুধু পর্যটনকেন্দ্রের সৌন্দর্যে নয়, স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও পড়তে পারে।

কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র ব্যবসা, পরিবহন, হোটেল-রেস্টুরেন্ট এবং অসংখ্য পরিবারের জীবিকা জড়িত। তাই পর্যটন ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া কোনো সমাধান নয়।

যেসব প্রতিষ্ঠান আইন মেনে পরিচালনার সুযোগ রাখে, তাদের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও পরিবেশগত শর্ত পূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। আর যেসব স্থাপনা আইন লঙ্ঘন করে পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি করছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পয়োনিষ্কাশন, পাহাড় ও গাছপালা সংরক্ষণ, ভবনের নিরাপত্তা এবং অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

মেরিন ড্রাইভ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য, জনগণের সম্পদ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণযোগ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল।

কয়েক লাখ টাকা জরিমানা দিয়ে যদি কোটি টাকার ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে জরিমানা আইন অমান্যকারীদের কাছে শাস্তির পরিবর্তে ব্যবসার খরচে পরিণত হবে। নোটিশের পর নোটিশ, জরিমানার পর জরিমানা—কিন্তু পরিবেশ ধ্বংসের কার্যক্রম বন্ধ না হলে এসব পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের প্রাণহানির ঘটনা আমাদের সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। অনুমোদনহীন স্থাপনা, দুর্বল নজরদারি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের জীবনকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

তাই এখন আর আশ্বাস নয়, প্রয়োজন দৃশ্যমান পদক্ষেপ। রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক শক্তি কিংবা মালিকের পরিচয় নয়—আইনই হোক শেষ কথা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পরিবেশ আইন প্রয়োগে কোনো ধরনের পক্ষপাত বা প্রভাব যেন কাজ না করে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং কর্মকর্তাদের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মেরিন ড্রাইভকে রক্ষা করা শুধু একটি পর্যটন এলাকার সৌন্দর্য রক্ষার বিষয় নয়; এটি উপকূলীয় পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ রক্ষারও প্রশ্ন। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অপরিকল্পিত স্থাপনা ও অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের চাপ একসময় এই প্রাকৃতিক সম্পদকে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে।

প্রধান সম্পাদক- আ.ত.ম. শামসুজ্জামান

ইশা ফাউন্ডেশন’র একটি প্রকাশনা

অনুসরণ করুন